দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
দেওবন্দ। বর্তমান বিশ্বের একমাত্র নিখুঁত এরাবিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, ইলমে হাদিস ও ইলমে তাফসিরের মাকবুল এবং অনন্য দরসগাহ। আউলিয়ায়ে কেরাম এবং মাশায়িখে হিন্দের একমাত্র রুহানি দীক্ষাগার। হিন্দের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্র সৈনিকদের একমাত্র অবস্থান কেন্দ্রই হলো 'দারুল উলূম দেওবন্দ'। যে বিদ্যাপীঠকে ‘আযহারে হিন্দ’ বলে আখ্যা দেয়া হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে বলা হয় উলামা ও ফুযালাদের ‘ইখলাস কা তাজমাহাল’। এখানেই শেষ না... তা এমন একটি বৃক্ষ, যেটাকে আল্লাহ প্রেমিকরা তারই ইশারা ও ইলহামের মাধ্যমেই তার উপর পূর্ণ ভরসা রেখেই একনিষ্ঠতা ও লিল্লাহিয়্যাতকে পূজি করে রূপণ করেছেন। যার শাখা প্রশাখা আজ সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বের রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। এবং পুরো জাতীকে বিলিয়ে দিচ্ছে তার সুবাস। আলোকিত করছে তার আলোয়। তা এমন একটি চিন্তাচেতনার জ্ঞান সমুদ্র, যা নবুওয়াতের বক্ষ থেকে প্রবাহ হয়ে সাহাবাদের বক্ষ বেয়ে হিন্দুস্তান এসে আল্লামা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি’র বক্ষ ঘেসে মাওলানা কাসিম নানুতবি রাহ.; মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙগুহি রাহ.; মাওলানা ইয়াকুব নানুতবি রাহ.’র মাধ্যমে দেওবন্দের পুষ্পবাগানে এসে স্তম্ভিত হয়। যার নদীমালা হিন্দের সীমা অতিক্রম করে আজ বিশ্বের মানচিত্রে বিস্তৃত হয়ে আছে। আর সমগ্র বিশ্বের ইলম পিপাসুরা তার অথবা তার থেকে সৃষ্ট পেয়াল থেকে তাদের ইলমের পিপাসা নিবারণ করছে। উল্লেখ্য যে, মুঘল শাসনামলের শেষ দিকে পুরো ভারতবর্ষে যখন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ ভারত বর্ষের ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে এ ফরমান জারি করে, ‘এখন থেকে বাদশাহ সালামতের রাজ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই হুকুমত চলবে।’ সেই দিন মুসনাদুল হিন্দ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. এর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ আবদুল আযিয মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ. দীপ্তত কণ্ঠে এই ঘোষণা করেন যে- ‘ভারতবর্ষ এখন দারুল হরব। (শত্রুকবলিত দেশ) তাই প্রত্যেক ভারতবাসির উপর ফরজ হলো- একে স্বাধীন করা। তার এই সাহসী উচ্চারণ পুরো দিকদিগন্তে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের ন্যায়। ফলে দিশেহারা মুসলিম জাতি উলামায়ে কেরাম’র নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব সমাপ্ত শুরু করেন। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয়, আলেম-উলামার উপর দমন-নিপীড়ন। হাজার হাজার আলেম-উলামাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। দিল্লির প্রতিটা অলিগলি আলেম ওলামার রক্তে রঞ্জিত হয়। এহেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইসলামের নামটুকু হয়তো আর বাকি থাকবে না।বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত আরো খতরনাকই হবে। এমতাবস্থায় জাতীর এ ক্রান্তিলগ্নে একদল দীক্ষাপ্রাপ্ত সচেতন মুজাহিদ তৈরি করে তাদের মাধ্যমে আযাদি আন্দোলনের স্রোতধারাকে ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়া সহজতর বলে মনে হলো। তাই দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা, শলা-পরামর্শের পর সাময়িকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত, দীনি চেতনায় উৎসর্গ একদল জানবায মুজাহিদ তৈরির লক্ষ্যে এবং ইলমে নববির সংরক্ষণ ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৮৬৬ ঈসায়ি সনের ৩০ মে, মোতাবেক ১৫ই মুহররম ১২৮৩ হিজরি সনে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ নামক গ্রামে ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গনে একটি ডালিম গাছের ছায়ায়, ইলহামিভাবে কোনো প্রকার সরকারি সাহায্য ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের দারুল উলুম দেওবন্দ। (মুখতাসার তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ, মাও. মুহাম্মদ উল্লাহ কাসিমী, পৃষ্ঠা. ৫৯, মাকতাবায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ)
দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা। দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনা কালেও রয়েছে কিছু মানুষের ত্যাগ। যথাক্রমে-তিনারা হলেন-হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবি রহ. (ইন্তেকাল-১২৯৭ হি.); হযরত মাওলানা ইয়াকুব নানুতবি রহ. (১৩০২ হি.); হযরত মাওলানা হাজি আবেদ হোসাইন রহ. (১৩৩১ হি.) যিনি সর্ব প্রথম দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন। হযরত মাওলানা শাহ রফি উদ্দিন রহ. (১৩০৮ হি.); হযরত মাওলানা যুলফিকার দেওবন্দি রহ. (১৩২২ হি.); হযরত মাওলানা ফযলুর রহমান উসমানি রহ. (১৩২৫ হি.)। তো তাদের মধ্য হতে মাও. রফি উদ্দিন সাহেব ছিলেন অন্যতম। তিনি একদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিয়ে গিয়ে বর্তমান সাত্তা মসজিদের পাশে একটি স্থানে দাগ টেনে দিলেন এবং সেখানেই মাদরাসার ফাউন্ডেশন দিতে বলেন। তিনি যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন, সত্যিই তিনি রাসুলের দেখিয়ে দেয়া স্থানে টেনে যাওয়া দাগ দেখতে পেলেন। অবশেষে সেখানেই বিখ্যাত ইলমি প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ’র শিক্ষাভবন নির্মাণ হলো। (সূত্র: তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ, ভূমিকা; মাকতাবায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ; ইখলাস কা তাজমহল)
হজরত মাও. মুল্লা মাহমুদ। যিনি ছিলেন, দারুল উলুম দেওবন্দের গর্বিত প্রথম ছাত্র। প্রথম ছাত্র ছিলেন, মৌলভি মাহমুদ। যিনি পরবর্তীতে শায়খুল হিন্দ নামে পুরো বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। এই দেওবন্দের রয়েছে আরো বিস্ময়কর কিছু ঘটনা। যেগুলো তার মাহাত্মকে আরো মর্যাদাবান করে। হজরত মাওলানা রফি উদ্দিন রাহ. মুহতামিম থাকাবস্থায় একবার দেওবন্দে আরেকটা বিষ্ময়কর ঘটনা ঘটে। একটা ছাত্র মাদরাসার বোর্ডিং থেকে খাবার উঠিয়ে সে খানার পাত্রটি নিয়ে সোজা চলে আসলো মাওলানা রফি উদ্দিন সাহেব’র কাছে। এসে বলতে শুরু করলো- এই শুরবা কি খাওয়ার জন্য বানানো হয়েছে? নাকি ওজু করার জন্য। এটা তো একদম খাবারের উপযোগী-ই না। এটা একটা শুরবা হলো! শুধুই তো টাটকা পানি দেখা যাচ্ছে। এটা কেমনে খাবো? এর দ্বারা তো ওজু করা যাবে!
তার এ অভিযোগ শুনার পর রফি উদ্দিন সাহেব খুব দূরদৃষ্টি দিয়ে তার চেহারার দিকে অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন- এই ছেলেটা সত্যিকারার্থে দারুল উলূম দেওবন্দে’র রেজিস্টারভুক্ত কোনো ছাত্র না। তার এ কথা শুনে উপস্থিত ছাত্র উস্তায সবাই তাক লেগে গেলো। আসলে বিষয়টা কি! হজরত কেমনে একটা ছেলেকে বিশ্বাসের সাথে মাদরাসার ছাত্রই না বলে অস্বীকার করে বসলেন। কারণ কি? সবাই কিছুটা উদ্যত হয়ে মাদরাসার রেজিস্টারবুকে ওর নাম খুঁজাখুঁজি শুরু করলো। কিন্তু সত্যিকারই দেখা গেলো কি(!) বাস্তবে-ই ও দারুল উলূমের ছাত্র না। ধোঁকাবাজি করে বোর্ডিং লিস্টে নিজের নাম লিখিয়ে খাবার খাচ্ছে। এবার সকল ছাত্র উস্তাদ হজরতের কাছে এর রহস্য জানতে চাইলেন যে, কেমনে আপনি একদম বিশ্বাসের সাথে বললেন ও দারুল উলুমের ছাত্র-ই না। তখন রফি উদ্দিন সাহেব বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম হুজুর সা. নিজ হাতে দুধ বিতরণ করছেন আর ছাত্ররা নিজ নিজ পাত্র দিয়ে দুধ সংগ্রহ করছে।
আলহামদুলিল্লাহ্! সেদিন যারাই দুধ সংগ্রহ করেছে সবার চেহারাই আমার কাছে পরিচিত। এমনকি যারাই দারুল উলুমে ভর্তি হয় সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাদের চেহারাগুলি চিনে ফেলি। এজন্য খানা সম্পর্কে ওর অভিযোগ করার পর আমি যখন গভীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম, মনে হলো, ওকে তো সেদিন আমি রাসুল সা.’র হাত থেকে দুধ সংগ্রহ করতে দেখি নি। সুতরাং ও দারুল উলূমের ছাত্র না। এজন্যই আমি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথেই বলেছিলাম ও প্রকৃতপক্ষে দারুল উলুমের রেজিস্টারভুক্ত ছাত্র না। উল্লেখ্য যে, অনেক আগেকার গল্প। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে একবার শাহ রফি উদ্দিন রাহ. স্বপ্নে দেখলেন যে দারুল উলূমের মুলস্রি নিকটবর্তী কূপ দুধে ভর্তি হয়ে গেছে এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেয়ালা দিয়ে উক্ত দুধ বন্টন করছেন। কেহ বড় পাত্র দিয়ে দুধ নিচ্ছে। আবার কেহ কেহ ছোট ছোট পাত্র দিয়ে দুধ নিচ্ছে। ঘুম থেকে জাগার পর হজরত এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন এভাবে যে, এখানে দুধ ধারা উদ্দেশ্য হলো, ইলম। সুতরাং কেয়ামত অবধি যারাই এখানে পড়তে আসবে প্রত্যেকে-ই নিজ নিজ মেহনতের উপর ইলম লাভে ধন্য হবে। এই পাত্রের মতো। কেউ কম কেউ বেশী। এই দারুল উলুম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যারা দারুল উলুম দেখতে এসেছে। মুগ্ধ হয়েছে।
বলছিলাম, ১৩৭৭হিজরি’র কথা। তৎকালিন আফগানিস্তান’র বাদশা মুহাম্মদ যাহির শাহ দারুল উলুম দেওবন্দ আগমন করেন। আগমন উপলক্ষে তার সম্মানার্থে দারুল উলুম দেওবন্দে এক জলসার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় প্রায় বিশ হাজার লোকের সমাগম ঘটে। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো দেওবন্দ এলাকা। মুহাতারাম বাদশা জাহির প্রথমে একে একে দারুল উলুমের সকল আঙিনা ঘুরে দেখেন। একদম শিক্ষাভবন থেকে নিয়ে মাতবাখ, ওজুখানা, গোসলখানা, লাইব্রেরি, মসজিদ ইত্যাদি। দেখে তার চক্ষু শীতল করেন। তারপর হাজির হোন মাজলিসে। শুরু করেন তার অনুভূতিঘেরা বক্তিতা। শুরুতেই হামদ ও সালাত পাঠ করেন। তারপর বলেন, ‘আমি আজ আমার স্বপ্নপুরি দারুল উলূম দেওবন্দে আসতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। পাশাপাশি আমি আজ অনেক আনন্দিতও। দারুল উলুম দেওবন্দের সুঘ্রাণ আফগানের প্রতিটি বালুকণায় মিশে আছে। এখানের উলামা তালাবার প্রতি আফগানীদের রয়েছে অকুন্ঠ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমি মন থেকে আপনাদের শ্রদ্ধা করি। ভালোবাসি। কাছে টানি। আর আফগানে একথাই শুধু প্রসিদ্ধ না যে দারুল উলুম একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; বরং এটা সবাই বলতে বাধ্য যে দারুল উলুমই হলো আফগানের জমিতে ইলম সরবরাহের উৎস। এখান থেকেই শিক্ষালাভ করে বহু হক্কানি আলেমেদীন আফগান গিয়ে ইলমের আলোকরশ্মী জ্বালাচ্ছেন। যা আজ অবধি চলমান। তাদের ছোঁয়ায় হাজারো মানুষ সঠিক দিশা পাচ্ছে। আফগানের আকাশে বাতাসে ‘ক্বালাল্লাহ ক্বালা রাসুলুল্লাহ সা.’র সুর ভাসছে। মানুষের মাঝে ইলমি জযবা তৈরি হচ্ছে। তাই উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ না শুধু বরং চিরকৃতজ্ঞ। এরকমই ছিলো তার লালিত স্বপ্নপুরিতে দাঁড়িয়ে অনুভূতি ঘেরা কিছু কথা। কিন্তু এখানেই শেষ না। এবার জানালেন তার ইচ্ছার কথা। স্বপ্নের কথা। ভালোবাসার কথা। তা কি? তিনি দারুল উলুম এ একটা গেইট করে দেবেন। কর্তৃপক্ষ যেন মনযূর করে। তাকে সে সুযোগটা করে দেয়া হয়। যাতে অন্তত দারুল উলুমের একটা ইটে হলেও তার দানের অংশীদারিত্ব থাকে। মনযূরি হলো। শুরু হলো, গেইট নির্মাণের কাজ। তিনতলা বিশিষ্ট একটা নান্দনিক গেইট করলেন মনকাড়া। অসাধারণ। চোখজুড়ানো। মনমাতানো। যেটা আজ তার নামকরনেই স্মৃতিস্বরূপ ‘বাবুয যাহির' হিসেবেই প্রসিদ্ধ।
প্রতিটা তলায় রয়েছে পাঁচ-ছয়’জন বিশিষ্ট থাকার রুম। বর্তমানে দারুল উলূমের উলুমুল হাদিস বিভাগ রয়েছে এ গেইটেরই তৃতীয় তলায়। পাশাপাশি, থাকছে প্রায় শ’ খানেক ছাত্রের ছাত্রাবাস। আলহামদুলিল্লাহ্ সে ঐতিহাসিক দারুলু উলুম দেওবন্দের আদলেই গড়ে উঠেছে আজ, উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যা কওমি মাদরাসা নামে খ্যাত। এখান থেকে ইলমে দীনের অমৃত সুধা পানে পরিতৃপ্ত হচ্ছে কোটি কোটি মুসলমান। আলোকিত হচ্ছে পথহারা মানুষগুলো। এবং ইলমে নববির আলোসিক্ত এ কওমি মাদরাসাগুলোই হচ্ছে মুসলমানদের দীন-ঈমান সংরক্ষণের সর্বশেষ দুর্গ। সবিশেষ দোআকরি, আল্লাহ এ দুর্গগুলোকে কিয়ামত অবধি প্রতিষ্ঠিত রাখুক। আমিন ॥
দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা। দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনা কালেও রয়েছে কিছু মানুষের ত্যাগ। যথাক্রমে-তিনারা হলেন-হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবি রহ. (ইন্তেকাল-১২৯৭ হি.); হযরত মাওলানা ইয়াকুব নানুতবি রহ. (১৩০২ হি.); হযরত মাওলানা হাজি আবেদ হোসাইন রহ. (১৩৩১ হি.) যিনি সর্ব প্রথম দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন। হযরত মাওলানা শাহ রফি উদ্দিন রহ. (১৩০৮ হি.); হযরত মাওলানা যুলফিকার দেওবন্দি রহ. (১৩২২ হি.); হযরত মাওলানা ফযলুর রহমান উসমানি রহ. (১৩২৫ হি.)। তো তাদের মধ্য হতে মাও. রফি উদ্দিন সাহেব ছিলেন অন্যতম। তিনি একদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিয়ে গিয়ে বর্তমান সাত্তা মসজিদের পাশে একটি স্থানে দাগ টেনে দিলেন এবং সেখানেই মাদরাসার ফাউন্ডেশন দিতে বলেন। তিনি যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন, সত্যিই তিনি রাসুলের দেখিয়ে দেয়া স্থানে টেনে যাওয়া দাগ দেখতে পেলেন। অবশেষে সেখানেই বিখ্যাত ইলমি প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ’র শিক্ষাভবন নির্মাণ হলো। (সূত্র: তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ, ভূমিকা; মাকতাবায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ; ইখলাস কা তাজমহল)
হজরত মাও. মুল্লা মাহমুদ। যিনি ছিলেন, দারুল উলুম দেওবন্দের গর্বিত প্রথম ছাত্র। প্রথম ছাত্র ছিলেন, মৌলভি মাহমুদ। যিনি পরবর্তীতে শায়খুল হিন্দ নামে পুরো বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। এই দেওবন্দের রয়েছে আরো বিস্ময়কর কিছু ঘটনা। যেগুলো তার মাহাত্মকে আরো মর্যাদাবান করে। হজরত মাওলানা রফি উদ্দিন রাহ. মুহতামিম থাকাবস্থায় একবার দেওবন্দে আরেকটা বিষ্ময়কর ঘটনা ঘটে। একটা ছাত্র মাদরাসার বোর্ডিং থেকে খাবার উঠিয়ে সে খানার পাত্রটি নিয়ে সোজা চলে আসলো মাওলানা রফি উদ্দিন সাহেব’র কাছে। এসে বলতে শুরু করলো- এই শুরবা কি খাওয়ার জন্য বানানো হয়েছে? নাকি ওজু করার জন্য। এটা তো একদম খাবারের উপযোগী-ই না। এটা একটা শুরবা হলো! শুধুই তো টাটকা পানি দেখা যাচ্ছে। এটা কেমনে খাবো? এর দ্বারা তো ওজু করা যাবে!
তার এ অভিযোগ শুনার পর রফি উদ্দিন সাহেব খুব দূরদৃষ্টি দিয়ে তার চেহারার দিকে অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন- এই ছেলেটা সত্যিকারার্থে দারুল উলূম দেওবন্দে’র রেজিস্টারভুক্ত কোনো ছাত্র না। তার এ কথা শুনে উপস্থিত ছাত্র উস্তায সবাই তাক লেগে গেলো। আসলে বিষয়টা কি! হজরত কেমনে একটা ছেলেকে বিশ্বাসের সাথে মাদরাসার ছাত্রই না বলে অস্বীকার করে বসলেন। কারণ কি? সবাই কিছুটা উদ্যত হয়ে মাদরাসার রেজিস্টারবুকে ওর নাম খুঁজাখুঁজি শুরু করলো। কিন্তু সত্যিকারই দেখা গেলো কি(!) বাস্তবে-ই ও দারুল উলূমের ছাত্র না। ধোঁকাবাজি করে বোর্ডিং লিস্টে নিজের নাম লিখিয়ে খাবার খাচ্ছে। এবার সকল ছাত্র উস্তাদ হজরতের কাছে এর রহস্য জানতে চাইলেন যে, কেমনে আপনি একদম বিশ্বাসের সাথে বললেন ও দারুল উলুমের ছাত্র-ই না। তখন রফি উদ্দিন সাহেব বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম হুজুর সা. নিজ হাতে দুধ বিতরণ করছেন আর ছাত্ররা নিজ নিজ পাত্র দিয়ে দুধ সংগ্রহ করছে।
আলহামদুলিল্লাহ্! সেদিন যারাই দুধ সংগ্রহ করেছে সবার চেহারাই আমার কাছে পরিচিত। এমনকি যারাই দারুল উলুমে ভর্তি হয় সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাদের চেহারাগুলি চিনে ফেলি। এজন্য খানা সম্পর্কে ওর অভিযোগ করার পর আমি যখন গভীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম, মনে হলো, ওকে তো সেদিন আমি রাসুল সা.’র হাত থেকে দুধ সংগ্রহ করতে দেখি নি। সুতরাং ও দারুল উলূমের ছাত্র না। এজন্যই আমি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথেই বলেছিলাম ও প্রকৃতপক্ষে দারুল উলুমের রেজিস্টারভুক্ত ছাত্র না। উল্লেখ্য যে, অনেক আগেকার গল্প। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে একবার শাহ রফি উদ্দিন রাহ. স্বপ্নে দেখলেন যে দারুল উলূমের মুলস্রি নিকটবর্তী কূপ দুধে ভর্তি হয়ে গেছে এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেয়ালা দিয়ে উক্ত দুধ বন্টন করছেন। কেহ বড় পাত্র দিয়ে দুধ নিচ্ছে। আবার কেহ কেহ ছোট ছোট পাত্র দিয়ে দুধ নিচ্ছে। ঘুম থেকে জাগার পর হজরত এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন এভাবে যে, এখানে দুধ ধারা উদ্দেশ্য হলো, ইলম। সুতরাং কেয়ামত অবধি যারাই এখানে পড়তে আসবে প্রত্যেকে-ই নিজ নিজ মেহনতের উপর ইলম লাভে ধন্য হবে। এই পাত্রের মতো। কেউ কম কেউ বেশী। এই দারুল উলুম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যারা দারুল উলুম দেখতে এসেছে। মুগ্ধ হয়েছে।
বলছিলাম, ১৩৭৭হিজরি’র কথা। তৎকালিন আফগানিস্তান’র বাদশা মুহাম্মদ যাহির শাহ দারুল উলুম দেওবন্দ আগমন করেন। আগমন উপলক্ষে তার সম্মানার্থে দারুল উলুম দেওবন্দে এক জলসার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় প্রায় বিশ হাজার লোকের সমাগম ঘটে। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো দেওবন্দ এলাকা। মুহাতারাম বাদশা জাহির প্রথমে একে একে দারুল উলুমের সকল আঙিনা ঘুরে দেখেন। একদম শিক্ষাভবন থেকে নিয়ে মাতবাখ, ওজুখানা, গোসলখানা, লাইব্রেরি, মসজিদ ইত্যাদি। দেখে তার চক্ষু শীতল করেন। তারপর হাজির হোন মাজলিসে। শুরু করেন তার অনুভূতিঘেরা বক্তিতা। শুরুতেই হামদ ও সালাত পাঠ করেন। তারপর বলেন, ‘আমি আজ আমার স্বপ্নপুরি দারুল উলূম দেওবন্দে আসতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। পাশাপাশি আমি আজ অনেক আনন্দিতও। দারুল উলুম দেওবন্দের সুঘ্রাণ আফগানের প্রতিটি বালুকণায় মিশে আছে। এখানের উলামা তালাবার প্রতি আফগানীদের রয়েছে অকুন্ঠ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমি মন থেকে আপনাদের শ্রদ্ধা করি। ভালোবাসি। কাছে টানি। আর আফগানে একথাই শুধু প্রসিদ্ধ না যে দারুল উলুম একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; বরং এটা সবাই বলতে বাধ্য যে দারুল উলুমই হলো আফগানের জমিতে ইলম সরবরাহের উৎস। এখান থেকেই শিক্ষালাভ করে বহু হক্কানি আলেমেদীন আফগান গিয়ে ইলমের আলোকরশ্মী জ্বালাচ্ছেন। যা আজ অবধি চলমান। তাদের ছোঁয়ায় হাজারো মানুষ সঠিক দিশা পাচ্ছে। আফগানের আকাশে বাতাসে ‘ক্বালাল্লাহ ক্বালা রাসুলুল্লাহ সা.’র সুর ভাসছে। মানুষের মাঝে ইলমি জযবা তৈরি হচ্ছে। তাই উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ না শুধু বরং চিরকৃতজ্ঞ। এরকমই ছিলো তার লালিত স্বপ্নপুরিতে দাঁড়িয়ে অনুভূতি ঘেরা কিছু কথা। কিন্তু এখানেই শেষ না। এবার জানালেন তার ইচ্ছার কথা। স্বপ্নের কথা। ভালোবাসার কথা। তা কি? তিনি দারুল উলুম এ একটা গেইট করে দেবেন। কর্তৃপক্ষ যেন মনযূর করে। তাকে সে সুযোগটা করে দেয়া হয়। যাতে অন্তত দারুল উলুমের একটা ইটে হলেও তার দানের অংশীদারিত্ব থাকে। মনযূরি হলো। শুরু হলো, গেইট নির্মাণের কাজ। তিনতলা বিশিষ্ট একটা নান্দনিক গেইট করলেন মনকাড়া। অসাধারণ। চোখজুড়ানো। মনমাতানো। যেটা আজ তার নামকরনেই স্মৃতিস্বরূপ ‘বাবুয যাহির' হিসেবেই প্রসিদ্ধ।
প্রতিটা তলায় রয়েছে পাঁচ-ছয়’জন বিশিষ্ট থাকার রুম। বর্তমানে দারুল উলূমের উলুমুল হাদিস বিভাগ রয়েছে এ গেইটেরই তৃতীয় তলায়। পাশাপাশি, থাকছে প্রায় শ’ খানেক ছাত্রের ছাত্রাবাস। আলহামদুলিল্লাহ্ সে ঐতিহাসিক দারুলু উলুম দেওবন্দের আদলেই গড়ে উঠেছে আজ, উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যা কওমি মাদরাসা নামে খ্যাত। এখান থেকে ইলমে দীনের অমৃত সুধা পানে পরিতৃপ্ত হচ্ছে কোটি কোটি মুসলমান। আলোকিত হচ্ছে পথহারা মানুষগুলো। এবং ইলমে নববির আলোসিক্ত এ কওমি মাদরাসাগুলোই হচ্ছে মুসলমানদের দীন-ঈমান সংরক্ষণের সর্বশেষ দুর্গ। সবিশেষ দোআকরি, আল্লাহ এ দুর্গগুলোকে কিয়ামত অবধি প্রতিষ্ঠিত রাখুক। আমিন ॥

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন